সরকারি, বেসরকারি ও বিশ্বজনীন সংস্থা Public, Private and Global Enterprises

 সরকারি, বেসরকারি ও বিশ্বজনীন সংস্থা Public, Private and Global Enterprises

Public, Private and Global Enterprises

 

■ ভূমিকা [Introduction]


পৃথিবীতে তিন ধরনের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বিরাজ করে। ধনতান্ত্রিক, সমাজতান্ত্রিক ও মিশ্র অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কারবারের প্রকৃতি ও গঠন পরিবর্তিত হয়। 1990 খ্রিস্টাব্দে রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার পতন এবং 1991 খ্রিস্টাব্দে ভারতবর্ষে নতুন অর্থনৈতিক নীতি (New Economic Policy) অনুসরণ করার পর অবস্থা দ্রুত বদলাতে থাকে। বিশ্বজোড়া ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার পুনরুত্থানে সরকারি, বেসরকারি ও বিশ্বজনীন সংস্থার বিকাশ, বিবর্তন ও সম্প্রসারণ ঘটে। বর্তমানে জটিল ক্রমবর্ধমান কারবারি জগতে সরকারি, বেসরকারি ও বিশ্বজনীন সংস্থার ভূমিকা নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে।


ভারতবর্ষে সরকারি, বেসরকারি ও যৌথ কারবার বিভিন্ন রূপে কাজ করে চলেছে। স্বাধীন ভারতে প্রথম
শিল্পনীতি গৃহীত হয় 1948 খ্রিস্টাব্দে। পরবর্তী শিল্পনীতিগুলি গৃহীত হয় 1956, 1970, 1973, 1977, 1980
ও 1991 খ্রিস্টাব্দে।



সরকারি সংস্থা ( Public Sector)

কারবারি সংস্থার মালিকানা সরকারের হাতে থাকলে তাকে সরকারি সংস্থা বলে। সরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত, পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠান যখন অর্থনৈতিক কাজকর্মে লিপ্ত থাকে তখন তাকে রাষ্ট্রীয় কারবার বা সরকারি সংস্থা বলে। এ. এইচ. হ্যানসন (A. H. Hanson)-এর মতে, রাষ্ট্রীয় কারবার বলতে সরকারের মালিকানায় শিল্প, ব্যাবসা, কৃষি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালনাকে বোঝায় (Public enterprise means state ownership and operation of individual, agriculture, financial and commercial undertakings.)


একসময়ে সোভিয়েত রাশিয়া, চিন, ভিয়েতনাম ও ইউরোপের দেশগুলিতে সর্বাত্মক রাষ্ট্রীয় কারবার ছিল।
বর্তমানে চিনে যে সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালু আছে তা বাজারমুখী সমাজতন্ত্র (Market Social-
ism) বলে পরিচিত। অধ্যাপক সেলিসিঙ্গার বলেছেন, “যদি পূর্ণ সাম্যবাদ আমাদের লক্ষ্য না হয় তা হলে তা
পরিহারের শ্রেষ্ঠ পদ্ধতি হল সরকারি ক্ষেত্রের সম্প্রসারণ।” অধ্যাপক মৃত্যুঞ্জয় বন্দ্যোপাধ্যায় মনে করেন,
সরকারি কারবার বলতে সেই সমস্ত প্রতিষ্ঠানকে বোঝায় যার মালিক সরকার এবং সরকার কর্তৃক ব্যবস্থাপিত ও পরিচালিত হয়ে থাকে।


উদাহরণ : 1. স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (SBI) ( চালু প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ)
                2. ভারত হেভি ইলেকট্রিকাল লিমিটেড (BHEL) (নতুন প্রতিষ্ঠান স্থাপন)
                3. ইন্ডিয়ান আয়রন অ্যান্ড স্টিল কোম্পানি (IISCO) (বুগ্‌ণসংস্হ্য অধিগ্রহণ)
                4. ন্যাশনাল টেক্সটাইল কর্পোরেশন (NTC) (গণসংস্থা অধিগ্রহণ)


 

সরকারি সংস্থার বৈশিষ্ট্য (Features of Public Sector)


● মালিকানা (Ownership): সরকারি উদ্যোগ সরকারের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ কার্যকর থাকে।

● উদ্যোগপতি (Entrepreneurship) : সরকারি উদ্যোগে কারবার প্রতিষ্ঠিত হয়। সরকার উদ্যোক্তার
ভূমিকা পালন করে।
● মূলধন (Capital) : সরকার 51 শতাংশ বা তার অধিক মূলধন বিনিয়োগ করে।
● নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা (Control and Management) সরকারি ক্ষেত্রের নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা সরকারের হাতে থাকে। সরকার নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করে।
● জনকল্যাণ (Public) : সরকার কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে।


 

সরকারি সংস্থার সুবিধা (Advantages of Public Sector)


জাতীয় অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি সংগতি রেখে বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রীয় কারবার গড়ে উঠেছিল। 1956
খ্রিস্টাব্দের ভারতের শিল্প অভিমুখ ছিল সরকারিকরণ। পূর্বতন সেভিয়েত ইউনিয়ন, চিন, ভিয়েতনাম ও পূর্ব
ইউরোপের দেশগুলিতে সর্বাত্মক রাষ্ট্রীয় কারবার লক্ষ করা গেছে। 1990 খ্রিস্টাব্দে সোভিয়েত ও পূর্ব
ইউরোপের দেশগুলিতে সমাজতন্ত্রের পতনের সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক অবস্থা ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়।
সারা পৃথিবীতে 10,000-এর বেশি সরকারি সংস্থা বেসরকারি সংস্থায় পরিণত হয়। আমাদের দেশে VSNL
(বিদেশ সঞ্চার নিগম লিমিটেড) 2002 খ্রিস্টাব্দে বেসরকারি সংস্থা Tata Communication (টাটা
কমিউনিকেশন)-এ রূপান্তরিত হয়।


● কল্যাণকর রাষ্ট্র (Welfare State) : দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর পৃথিবীর সব দেশে কল্যাণকর
রাষ্ট্রের ধারণার উদ্ভব হয়েছে। কল্যাণকর রাষ্ট্রের ধারণার উদ্ভবের সঙ্গে সঙ্গে সরকার বেশি করে কারবারে অংশগ্রহণ করতে শুরু করে। সরকারি ক্ষেত্রে নিজের দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে পালন করতে সরকার নানা ধরনের রাষ্ট্রীয় কারবার গঠন করে। ভারতে তিনভাবে সরকার কারবারে অংশগ্রহণ করেছে। চালু প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ (স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া), নতুন প্রতিষ্ঠান স্থাপন (ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশন, ভারত হেভি ইলেকট্রিক্যাল) এবং রুণ প্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণ (ইসাকা, এন টি সি)।


● জাতীয় সম্পদের যথাযথ ব্যবহার (Proper Utilisation of National Resource) : জাতীয় আয়ের
অসম বণ্টন থেকে অর্থনৈতিক ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়। জাতীয় আয়ের সুষম বণ্টন ও সম্পদের কেন্দ্রীভবন রোধ করতে রাষ্ট্রীয় কারবার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সরকারি ক্ষেত্রকে প্রসারিত করে জনকল্যাণের উদ্দেশ্যে জাতীয় সম্পদের যথাযথ ব্যবহার সম্ভবপর হয়। 

● অবাধ বাণিজ্যনীতি পরিহার (Oppose Open Trade Policy) : অবাধ বাণিজ্যনীতি অনুসরণ করার
ফলে মুষ্টিমেয় কারবারির হাতে ধনসম্পদ পুঞ্জীভূত হয়েছে এবং সমাজকল্যাণ ব্যাহত হয়েছে। কারবারি ক্ষেত্রে অবাধ নীতির পরিবর্তে সরকারি পদক্ষেপ সংগত কারণে বৃদ্ধি পেয়েছে। আন্তর্জাতিক অর্থ ভাণ্ডার (IMF)-এর এক সমীক্ষা অনুসারে, 1991 খ্রিস্টাব্দে ভারতে উদার অর্থনীতি অনুসরণ করার ফলে দরিদ্র আরও দরিদ্র হয়েছে এবং ধনী আরও ধনী হয়েছে।


● জাতীয় অর্থনীতির সুষম উন্নতি (Balance Growth of National Economy) : ইস্পাত ও রাসায়নিক
শিল্প একদিকে যেমন মৌলিকশিল্প অন্যদিকে ভারীশিল্প। এই ধরনের শিল্প গড়ে তুলতে প্রচুর বিনিয়োগ করতে হয় বলে বেসরকারি উদ্যোক্তারা উৎসাহ বোধ করেন না। দেশের বিনিয়োগযোগ্য সঞ্চয়কে মূল ও ভারীশিল্পে লগ্নির মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতির সুষম উন্নতি সম্ভব হয়েছে। সরকারি কারবারের মাধ্যমে সরকার এই দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে পালন করে চলেছে। ভারতবর্ষে লৌহ ও ইস্পাত শিল্পে স্টিল অথরিটি অব ইন্ডিয়ার (SAIL) অবদান অনস্বীকার্য।

● কর্মসংস্থান (Employment) : সরকারি ক্ষেত্রে বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। 2010 খ্রিষ্টাব্দে সরকারি ক্ষেত্রে প্রায় 178 লক্ষ মানুষ নিযুক্ত ছিলেন।


● ন্যায্য দাম ( Reasonable Price) : লাভজনক প্রতিষ্ঠান না হওয়ায় ন্যায্য দামে উৎকৃষ্ট পণ্য ও সেবা
সরবরাহ করে থাকে।


● প্রতিরক্ষা (Defence) : জাতীয় স্বার্থে সরকারি ক্ষেত্র প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ করে। অর্ডিন্যান্স
ফ্যাক্টরি ব্যুরো 'Force Behind Our Forces’ প্রতিরক্ষায় অতন্ত্র প্রহরী হিসেবে কাজ করে চলেছে।


● পরিকাঠামো (Infrastructure) : পরিবহণ, সড়ক নির্মাণের মতো পরিকাঠামোগত ক্ষেত্রে সরকারি
ক্ষেত্রের অবদান অনস্বীকার্য।