যৌথ মূলধনি কোম্পানির বৈশিষ্ট্য (Features of Joint Stock Company)

 যৌথ মূলধনি কোম্পানির বৈশিষ্ট্য (Features of Joint Stock Company)


বিচারপতি লিন্ডলের মতে, কোম্পানি বহুসংখ্যক ব্যক্তির মিলিত সংস্থা। শেয়ারগ্রহীতারা মূলধন সরবরাহ করে কোম্পানির মালিক হন। কোম্পানিতে শেয়ারগ্রহীতাদের মালিকানার অংশ মূলধন সরবরাহের অনুপাতে নির্ধারিত হয়। কিন্তু প্রত্যেক শেয়ারগ্রহীতার ভোটাধিকার থাকে।

সাধারণভাবে ঘরোয়া কোম্পানি ও সর্বজনীন কোম্পানিকে যৌথ মূলধনি কোম্পানি বলা হয়। এদের কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়।

Features of Joint Stock Company

 


● মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ (Ownership and Control) : কোম্পানির প্রবর্তকরা কোম্পানি গঠন করে। আইনের চোখে কোম্পানির পৃথক সত্তা আছে। আইন অনুসারে কোম্পানির নিবন্ধন হয়। নিবন্ধন হওয়ার পর কোম্পানি শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহ করে। শেয়ারগ্রহীতারা কোম্পানির মালিক। ঘরোয়া কোম্পানির ক্ষেত্রে ন্যূনতম সদস্যসংখ্যা 2 এবং সর্বোচ্চ 200 জন হতে পারে। সর্বজনীন কোম্পানির ক্ষেত্রে ন্যূনতম সদস্যসংখ্যা 7 এবং সর্বোচ্চসংখ্যা শেয়ারের সংখ্যার সমান হতে পারে। শেয়ারগ্রহীতা কোম্পানির মালিক হলেও কোম্পানির দৈনন্দিন কাজকর্ম পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ
পরিচালক পর্ষদকে গ্রহণ করতে হয়।

 


● আইনগত মর্যাদা (Legal Status) :
আইনের চোখে কোম্পানির পৃথক সত্তা আছে। কোম্পানি ও মালিকের পৃথক সত্তার ধারণা ইংল্যান্ডের সলোমন বনাম সলোমন অ্যান্ড কোম্পানি (Saloman vs. Saloman and Co. Ltd) মামলার রায়ে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পরিচালকমণ্ডলী কোম্পানির মানবিক প্রতিনিধি হিসেবে আইন সৃষ্ট কৃত্রিম ব্যক্তির হয়ে কাজকর্ম পরিচালনা করে। কোম্পানির নিজস্ব সিলমোহর থাকে। সিলমোহর ছাড়া কোনো কাগজ বৈধ বলে গণ্য হবে না।

 


● মূলধন (Capital) :
কোম্পানির শেয়ারগ্রহীতারা শেয়ার ক্রয়ের মাধ্যমে কোম্পানিতে মূলধন সরবরাহ করে। শেয়ারগ্রহীতারাই কোম্পানির মালিক। ঘরোয়া কোম্পানি জনসাধারণের কাছ থেকে মূলধন সংগ্রহ করতে পারে না। সর্বজনীন কোম্পানি জনসাধারণের কাছ থেকে মূলধন সংগ্রহ করতে পারে। ঘরোয়া ও সর্বজনীন কোম্পানি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ-মূলধন সংগ্রহ করতে পারে। সর্বজনীন কোম্পানি কেবলমাত্র জনসাধারণের কাছে ঋণপত্র বিলি করে ঋণ-মূলধন সংগ্রহ করতে সমর্থ। কোম্পানি আইন অনুসারে উভয়ক্ষেত্রে হিসাবরক্ষা ও পরীক্ষা বাধ্যতামূলক।

 


● ব্যবস্থাপনা (Management) : শেয়ারগ্রহীতারা কোম্পানির মূলধনের মালিক কিন্তু ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনার দায়িত্ব পরিচালক পর্ষদের। পরিচালকমণ্ডলীর ক্ষমতা কোম্পানি আইন ও পরিমেল নিয়মাবলি দ্বারা নির্ধারিত হয়। কোম্পানির সর্বোচ্চ ব্যবস্থাপক পরিচালকমণ্ডলী। পরিচালকমণ্ডলীর সর্বোচ্চ পদে ম্যানেজিং ডিরেক্টর বা প্রধান কার্যনির্বাহক নিয়োগ করা হয়। প্রধান কার্যনির্বাহক পরিচালকমণ্ডলীর গৃহীত সিদ্ধান্ত কার্যকর করেন।


● স্থায়িত্ব (Stability) :
কোম্পানি আইন অনুসারে কোম্পানির পৃথক সত্তা আছে। আইনের প্রক্রিয়ায় কোম্পানির জন্ম হয় এবং কোম্পানির অবসান ঘটে। কোম্পানির চিরন্তন অস্তিত্ব আছে। কোনো সদস্যের মৃত্যু বা দেউলিয়া বা সদস্য পদ পরিবর্তনে কোম্পানির অস্তিত্ব বিপন্ন হয় না। কোম্পানির চলমান চিরন্তন সত্তা বর্তমান।



● ঝুঁকি ও দায় (Risk and Liability) :
শেয়ার দ্বারা সীমিত দায়বিশিষ্ট কোম্পানির শেয়ারগ্রহীতার দায় নামিক মূল্য (Nominal Value) বা (Face Value) দ্বারা সীমিত। শেয়ারগ্রহীতার ঝুঁকির পরিমাণ সীমিত।


● মুনাফা বণ্টন (Distribution of Profit) :
যৌথ মূলধনি কোম্পানি অর্জিত মুনাফার একটি অংশ সংরক্ষিত তহবিলে জমা করে বাকি অংশ লভ্যাংশ হিসেবে বণ্টন করে। প্রথমে অগ্রাধিকারযুক্ত শেয়ারগ্রহীতাদের লভ্যাংশ প্রদান করা হয়। পরবর্তী পর্যায়ে অবশিষ্ট অংশ মূলধনের অনুপাতে বণ্টন করা হয়। ঘরোয়া কোম্পানিতে বিলম্বিত দাবিযুক্ত শেয়ারগ্রহীতাদের শেষে মুনাফা বণ্টন করা হয়। সর্বজনীন কোম্পানিতে পরিচালক পর্ষদের ঘোষিত লভ্যাংশ নীতি বার্ষিক সাধারণ সভায় Annual General Meeting বা (AGM) পাস করাতে হয়।

 


যৌথ মূলধনি কারবারকে দু-ভাগে ভাগ করা যায়। যথা— সর্বজনীন কোম্পানি (Public Limited Company) ও ঘরোয়া কোম্পানি (Private Limited Company)


নীচে পৃথক পৃথক ভাবে এই দুই কোম্পানির সুবিধা ও অসুবিধা আলোচনা করা হল— 


সর্বজনীন কোম্পানির সুবিধা (Advantages of Public)

সর্বজনীন কোম্পানির সুবিধাগুলি হল—


● প্রভৃত পুঁজি (Enormous Capital) : মাঝারি ও বৃহৎ কারবারি প্রতিষ্ঠানের জন্য যথেষ্ট মূলধন প্রয়োজন। সর্বজনীন কোম্পানির শেয়ারের মূল্য ন্যূনতম হওয়াতে বেশি সংখ্যক মানুষের মধ্যে শেয়ার বিক্রি করে প্রচুর মূলধন সংগ্রহ করা যায়।


● আইনগত সত্তা (Legal Entity) : নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে যৌথ মূলধনি কোম্পানির আইনগত সত্তা আছে। কোম্পানির সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয় করতে পারে এবং অপরপক্ষের সঙ্গে চুক্তিতে আবদ্ধ হতে পারে। মালিকানা পরিবর্তনে কারবার বিলুপ্ত হয় না।


● শেয়ার হস্তান্তর (Transferability of Share) : সর্বজনীন কোম্পানির শেয়ার হস্তান্তরযোগ্য কিন্তু ঘরোয়া কোম্পানির ক্ষেত্রে শেয়ার হস্তান্তরযোগ্য নয়।


● সীমাবদ্ধ দায় (Limited Liability) : যৌথ মূলধনি কোম্পানির দায় শেয়ারের মূল্য দ্বারা সীমাবদ্ধ। দায় সীমাহীন মূলধনি কোম্পানি বিরল।


●  কর্মসংস্থান (Employment) : সর্বজনীন কোম্পানির আকার বড়ো হওয়াতে বহু মানুষের কর্মসংস্থান হয়।

উদাহরণ : রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজে আনুমানিক 2 লক্ষ লোকের, টাটা গোষ্ঠীতে 10 লক্ষ লোকের এবং বিড়লা গোষ্ঠিতে 20 লক্ষ লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে।


● সম্মিলিত গণতন্ত্র (Corporate Democracy) : যৌথ মূলধনি কোম্পানিতে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত পরিচালন পর্ষদ কারবার নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করে। সংখ্যাগরিষ্ঠের প্রতিনিধিদের দ্বারা পরিচালিত বলে কারবারে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিদ্যমান থাকে।

● করের সুবিধা (Tax Relief) : একমালিকানা বা অংশীদারি কারবার থেকে যৌথ মূলধনি কারবারে করের সুবিধা বেশি।


● সরকারি নিয়ন্ত্রণ (Government Control) : একমালিকানা প্রতিষ্ঠানের শুরুতে বা অবসায়নে সরকারি নিয়ন্ত্রণ নেই। কিন্তু যৌথ মূলধনি কারবারে সমাজের বহু মানুষের বিনিয়োগ ও কর্মস্থান হয় বলে সরকার কোম্পানি আইন, সিকিউরিটিস অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ বোর্ড অব ইন্ডিয়ার (সেবি) মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ কায়েম রাখে। এ ছাড়া বৃহৎ আকৃতির উৎপাদন প্রতিষ্ঠান হওয়াতে ব্যয় সংকোচন সম্ভব। পরিচালনার দক্ষতা, কারিগরি সহযোগিতা, গবেষণা ইত্যাদি সুবিধা ভোগ করা সম্ভব।