সমবায় সমিতির প্রকারভেদ (Different kinds of Cooperative Society)

 সমবায় সমিতির প্রকারভেদ (Different kinds of Cooperative Society)


ক্রেতা সমবায় সমিতি (Consumer's Cooperative Soclety) : মধ্যস্থতাকারীদের কাছ থেকে রক্ষা পেতে ন্যায্য মূল্যে ভোগপণ্য ক্রয়ের ইচ্ছায় ভোগকারীরা পরস্পর মিলিত হয়ে যে সমবায় সমিতি গঠন করে তাকে ক্রেতা সমবায় সমিতি বলে। ক্রেতা সমবায় সমিতির মাধ্যমে ন্যায্যমূল্যে গুণগতমান সম্পন্ন পণ্য পাওয়া সম্ভব। এই ধরনের সমিতির মাধ্যমে ফাটকাবাজি ও মুনাফাবাজি কিছুটা হলেও প্রতিরোধ করা সম্ভব। তিন ধরনের সমবায় ক্রেতা সমিতি লক্ষ করা যায়, যথা—

 

Different kinds of Cooperative Society

 ● ঋণদাতা সমবায় সমিতি (Cooperative Credit Society): 1912 খ্রিস্টাব্দের সমবায় সমিতি আইনে ঋণদানকারী সমবায় সমিতি গঠনের কথা বলা হয়। স্বল্প আয়বিশিষ্ট ব্যক্তিদের স্বল্প সুদে ও সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার জন্য ঋণদানকারী সমবায়সমিতি গড়ে ওঠে। সদস্যদের শেয়ার বিলির অর্থ থেকে সমবায় সমিতির তহবিল গড়ে ওঠে। এই ধরনের সমবায় সমিতি প্রান্তিক কৃষক, ক্ষুদ্র কারিগর, ছোটো ব্যবসায়ীদের মহাজনের হাত থেকে রক্ষা পেতে সাহায্য করে। সমবায় সমিতি শোষণমুক্তির হাতিয়াররূপে কাজ করতে পারে।

উদাহরণঃ দ্য নিউ আলিপুর কলেজ এমপ্লয়িজ কোঅপারেটিভ ক্রেডিট সোসাইটি লিমিটেড।


● উৎপাদক সমবায় সমিতি (Producers' Cooperative Society) : ক্ষুদ্রশিল্পের কারিগর, কুটির- শিল্পের কারিগর ও কৃষকরা একত্রিত হয়ে উৎপাদনের উপকরণের মালিক হয়ে উৎপাদন পরিচালনা করতে পারে। এই ধরনের সমবায় সমিতিকে উৎপাদক সমবায় সমিতি বলে।


উদাহরণ : কাইরা দুগ্ধ উৎপাদক সমবায়।


● সমবায় ব্যাংক (Cooperative Bank): কেন্দ্রীয় সমবায় সমিতি আইন অনুসারে রাজ্যস্তরে সমবায় ব্যাংক - ব্যাবসা পরিচালনার জন্য যে সমবায়সমিতি গড়ে ওঠে তাকে সমবায় ব্যাংক বলে। সমবায় ব্যাংক রিজার্ভ ব্যাংক অব্ ইন্ডিয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকে। বিভিন্ন সমবায় সমিতিকে ঋণের সুবিধা দেওয়া এদের প্রধান উদ্দেশ্য।

উদাহরণ : নদিয়া জেলা কোঅপারেটিভ ব্যাংক, বাংলাদেশ গ্রামীণ ব্যাংক।


● বিক্রয় সমবায় সমিতি (Cooperative Selling Society): ক্ষুদ্র উৎপাদনকারীরা যৌথভাবে বিক্রির উদ্দেশ্যে যে সমবায় সমিতি গড়ে তোলে তাকে বিক্রয় সমবায় সমিতি বলে। ক্ষুদ্রশিল্পের উৎপাদনকারীরা, কৃষিপণ্য উৎপাদনকারীরা বা দুগ্ধ উৎপাদনকারীরা একত্রিত হয়ে এই ধরনের সমবায় সমিতি গড়ে তোলে।

উদাহরণ : গুজরাট কোঅপারেটিভ মিল্ক মার্কেটিং ফেডারেশন লিমিটেড।


● গৃহনির্মাণ সমবায় সমিতি (Cooperative Housing Society) : স্বল্প আয়যুক্ত ব্যক্তিরা একত্রিত হয়ে গৃহনির্মাণের উদ্দেশ্যে এই ধরনের সমবায় সমিতি গড়ে তোলে। সহজ কিস্তিতে, স্বল্প সুদে গৃহনির্মাণের জন্য সুদের ব্যবস্থা করাই এই ধরনের সমবায় সমিতির কাজ।

উদাহরণ : সুরেন্দ্রনাথ হাউসিং সোসাইটি লিমিটেড।

● সমবায় সেবা সমিতি (Cooperative Service Society) : যে সমস্ত সমবায় সমিতি কোনো পণ্য ক্রয় বা বিক্রয় করে না কিন্তু সদস্যদের অসুবিধা সেবা মারফত দূর করে থাকে তাকে সমবায় সেবা সমিতি বলে।


● বহুমুখী সমবায় সমিতি (Multipurpose Cooperative Society) :
একসঙ্গে একাধিক উদ্দেশ্য সাধনের জন্য যে সমবায় সমিতি গঠিত হয় তাকে বহুমুখী সমবায় সমিতি বলে। এর ফলে সদস্যদের একাধিক সুবিধা প্রাপ্ত হয়। এই ধরনের সমবায় সমিতি ঋণদান, গৃহনির্মাণ, পণ্য ক্রয়বিক্রয়, কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়নে এই ধরনের সমবায় সমিতির ভূমিকা অগ্রগণ্য। 

কো-অপারেশন (Cooperation) গ্রন্থে সি. আর. ফে (C. R. Fay) উল্লেখ করেছেন ফিনল্যান্ড, নরওয়ে, সুইডেন, সুইটজারল্যান্ড প্রভৃতি দেশে বহুমুখী সমবায় সমিতি জনহিতকর কাজে যুক্ত আছে। আমাদের দেশে ন্যাশনাল প্ল্যানিং কমিশন (National Planning Commission) বহুমুখী সমবায় সমিতির পক্ষে মত ব্যক্ত করেছে।


● সমবায় বিমা সমিতি (Cooperative Insurance Society) :
বিমা ব্যবসায় অংশগ্রহণের জন্য যে সমবায় সমিতি গড়ে ওঠে তাকে সমবায় বিমা সমিতি বলে। সমিতির সদস্যরা বিমা গ্রহীতা হন। সমিতির মুনাফা সদস্যদের মধ্যে লভ্যাংশ হিসেবে বণ্টন করা হয়ে থাকে।


সমবায় সমিতির সুবিধা (Merits of Cooperative Society)

 ● সাংগঠনিক সুবিধা (Organisational Advantage) : (a) সহজ গঠন ; (b) স্বল্প শেয়ারমূল্য : (c) সমান ভোটাধিকার ; (d) গণতান্ত্রিক পরিচালন ব্যবস্থা : (e) সীমাবদ্ধ দায় ; (f) এক সদস্য এক ভোট নীতি কার্যকর হয়ে থাকে।


● অর্থনৈতিক সুবিধা (Economic Advantage) : সমাজের দুর্বলতম মানুষরা পারস্পরিক সুবিধা ভোগ করেন এবং উপকৃত হন। সমিতির সদস্যরা সমিতি পরিচালনা করেন ও বিনা পারিশ্রমিকে শ্রমদান করেন।


● সামাজিক সুবিধা (Social Advantage) :
সমিতির সদস্যরা সাধারণ স্বার্থে সমিতিতে যুক্ত হন। সমিতি জাতপাত নিরপেক্ষ, ধর্মনিরপেক্ষ ও লিঙ্গবৈষম্যহীন বলে সমাজে এর গ্রহণযোগ্যতা আছে।


● করের সুবিধা (Benefit of Tax) : সমবায় সমিতি আয়কর, বিক্রয়কর ও রেজিস্ট্রেশন ফি সংক্রান্ত সুবিধা ভোগ করে।


●  চিরন্তন স্থায়িত্ব (Permanent Life) : সমিতির সদস্যদের থেকে সমিতির পৃথক সত্তা আছে। সদস্যদের মৃত্যু, উন্মাদ বা পাগল হয়ে যাওয়া, অক্ষমতা এবং দেউলিয়া হওয়া সমিতির অস্তিত্বকে বিপন্ন করতে পারে না।


সমবায় সমিতির অসুবিধা (Disadvantage of Co-operative Society)


● অদক্ষ ব্যবস্থাপনা (Inefficient Management) : সমবায় সমিতির সদস্যদের মধ্য থেকে নির্বাচিত পরিচালকমণ্ডলী দ্বারা নির্বাচিত হয়। এরা সমবায় সমিতিকে দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করতে সমর্থ হয়না।


● সীমিত মূলধন (Limited Capital) : সদস্যসংখ্যা সীমিত হওয়ায় এবং সমাজের দুর্বলতম মানুষরা অংশগ্রহণ করায় মূলধন সংগ্রহের ক্ষমতা সীমিত থাকে।


● সামাজিক অসুবিধা (Social Disadvantage) : সমবায় সমিতির সদস্যরা স্বার্থপর মনোভাব ত্যাগ না করার জন্য স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সংঘাত দেখা দেয়। ফলস্বরূপ সমিতির কাজকর্ম ব্যাহত হয় এবং সমিতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গোপনীয়তার অভাব (Absence of Secrecy) : হিসাবসংক্রান্ত বিষয়ে সকল সদস্যদের আলোচনার অধিকার থাকায় গোপনীয়তা বজায় রাখা সম্ভবপর হয় না।


● অতিরিক্ত সরকারি নিয়ন্ত্রণ (Excessive Government Control) : সমবায় সমিতি কাজের দিক থেকে মোটেই স্বাধীন নয়। সমিতির কাজকর্ম, রেকর্ড ও হিসেব সমবায় পর্যবেক্ষক ও নিরীক্ষক পরীক্ষা করে থাকেন।