সমবায় সমিতির সংজ্ঞা (Definition of Cooperative Society)

সমবায় সমিতি [Cooperative Society ]


সমবায় সমিতির সংজ্ঞা (Definition of Cooperative Society)

1912 খ্রিস্টাব্দের ভারতের সমবায় আইনের 4 ধারায় বলা হয়েছে, সমবায় নীতির ভিত্তিতে সদস্যদের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতির উদ্দেশ্যে গঠিত সংস্থা হল সমবায় (Cooperative organisation is a society which has its objectives for the promotion of economic interests of its members in accordance with cooperative principles.)। 

 

Cooperative Society

1913 খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত Law and Principle of Cooperation গ্রন্থে এইচ.সি. কালভার্ট (H. C. Calvert) বলেছেন, “সমবায় হল এমন একটি সাংগঠনিক কাঠামো যার মাধ্যমে মানুষ নিজেদের মধ্যে সমান অধিকারের ভিত্তিতে অর্থনৈতিক স্বার্থরক্ষার উদ্দেশ্যে ঐচ্ছিকভাবে সমবেত হন।" ("Cooperative is a form of organisation wherein persons voluntarily associate together as human beings on the basis of equality for the promotion of the economic interest of themselves.")। 

 

আন্তর্জাতিক শ্রমসংস্থা (International Labour Organization or ILO)-এর মতে, সমবায় সমিতি হল সীমিত আয়ের ব্যক্তিদের সমিতি যাঁরা গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নিয়ন্ত্রিত কারবার সংগঠনের মাধ্যমে সম-অর্থনৈতিক উদ্দেশ্যসাধনের জন্য স্বেচ্ছায় মিলিত হন এবং প্রয়োজনীয় মূলধন সমানভাবে বিনিয়োগ করেন, ঝুঁকি ও সুযোগ সুবিধা ন্যায্যভাবে ভাগ করে নিতে সমর্থ হন 

 

(Cooperative is an association of persons, usually of limited means, who have voluntarily joined together to achieve a common economic end, through the formation of a democratically controlled business organisation, making equitable contributions to the capital required and accepting a fair share of risks and benefits of the undertaking.)

গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে পরিচালিত, সমপরিমাণ মূলধন দ্বারা গঠিত, সমান ঝুঁকি ও সুবিধাযুক্ত সংগঠন দ্বারা গোষ্ঠীর সীমিত আয়ের যে ঐচ্ছিক প্রতিষ্ঠান গঠিত হয় তাকে সমবায় কারবার বলে।


সমবায় সমিতির উদ্দেশ্য (Objective of Cooperative Society)

সমবায়নীতির ওপর ভিত্তি করে সদস্যদের আর্থিক অবস্থার উন্নতির উদ্দেশ্যে গঠিত সংস্থা সমবায় সমিতি হিসেবে পরিচিত। সমবায় সমিতির উদ্দেশাগুলি নীচে আলোচনা করা হল।


● শোষণের বিরুদ্ধে হাতিয়ার (Weapons against Exploitation) :
শোষণের হাত থেকে প্রান্তিক, দরিত্র ও স্বপ্নবিত্ত জনসাধারণকে রক্ষা করা সমবায়ের মূল উদ্দেশ্য। 

● সেবার মনোভাব [Service Mentality) : সাধারণের মঙ্গলসাধন সমবায়ের বিশেষ উদ্দেশ্য। সেবার মনোভাব ছাড়া যা অসম্ভব।

● সমস্বার্থ বিশিষ্ট (Common Interest) : সমস্বার্থ সম্পন্ন বলতে বোঝায় প্রত্যেকের স্বার্থের উদ্দেশ্য একই। সবারই একাত্মবোধের মনোভাব সমিতিকে সম্প্রীবিত করে।


● উদ্বৃত্ত বণ্টন (Distribution of Surplus) :
সমবায় সমিতির প্রধান উদ্দেশ্য মুনাফা অর্জন নয়। উবৃত্ত অর্থ সদস্যদের মধ্যে বণ্টন করা। মুনাফার এক দশমাংশ সমকল্যাণের কাজে এবং মুনাফার এক চতুর্থাংশ সঞ্চিত তহবিলে রাখার বিধান সমবায় আইনে আছে।


● মিতব্যয়িতার শিক্ষা (Study of Frugality) :
জনসাধারণকে একত্রিত করে মিতব্যয়িতার শিক্ষা দিতে সমবায় সমিতি গঠিত হয়। এতে স্বল্প ও নিম্ন আয়ের মানুষদের মধ্যে সায়ের ইচ্ছা জাগ্রত হয়।


● দারিদ্র্যামোচন (Elimination of Poverty) :
দরিদ্র ও অবহেলিত মানুষকে শোষণের হাত থেকে রক্ষা করে। সমাজের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি রচনা করে। সামাজিক সংঘাত দূর করতে সাহায্য করে। 

● মধ্যস্বত্বভোগীর অবসান (Eliminate Middleman): জনসাধারণ যাতে ন্যায্যমূল্যে উৎপাদিত পণ্যসামগ্রী ও সেবাজাত দ্রব্য পেতে পারে যার মধ্যে দিয়ে মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়ে থাকে।


সমবায় সমিতির বৈশিষ্ট্য (Features of Cooperative Society)


● মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ (Ownership and Control) :
সমবায় সমিতির সদস্যরাই সমিতির মালিক। সমবায় সমিতির সর্বনিম্ন সদস্যসংখ্যা দশ। আবাসন সমবায়ের সর্বনিম্ন সদস্যসংখ্যা আট। সর্বাধিক সদস্যসংখ্যা নির্দিষ্ট নয়। সমবায় সমিতির শেয়ার হস্তান্তরযোগ্য নয়। কোনো সদস্যের শেয়ার ফেরত দেওয়ার অধিকার আছে। প্রত্যেক সদস্যের একটি মাত্র ভোট দেওয়ার অধিকার আছে।


সমবায় সমিতির সদস্যদের দ্বারা নির্বাচিত পরিচালকমণ্ডলী সমবায় সমিতির নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনার অধিকারী। সমবায় সমিতির পরিচালকমণ্ডলীকে ম্যানেজিং কমিটি (Managing Committee) বলে। পরিচালকমণ্ডলীর একজন সভাপতি (President), সহ-সভাপতি (Vice President) ও একজন কর্মসচিব (Secretary) থাকতে পারে। পরিচালকমণ্ডলীর সভার সিদ্ধান্ত অনুসারে কর্মনীতি ও কর্মপদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়।


আইনগত মর্যাদা (Legal Status ) : সমবায় সমিতি বিধিবদ্ধ সংস্থা। সমবায় সমিতি আইন দ্বারা গঠিত কৃত্রিম ব্যক্তি। সমবায় সমিতির পৃথক সত্তা আছে। আইনগত পৃথক সত্তা থাকায় কোনো সভ্যের মৃত্যুতে সমবায় সমিতির অস্তিত্ব বিলোপ হয় না। সমবায় সমিতি নিবন্ধিত হওয়া প্রয়োজন। সমবায় সমিতির একটি সাধারণ সিলমোহর থাকে।


● মূলধন (Capital) : সমবায় সমিতি শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহ করে। সদস্যদের শেয়ার মূলধন সমিতির নিজস্ব মূলধন। সদস্য সংখ্যা কম বলে শেয়ার মূলধনও কম। সমিতির ঋণ গ্রহণ ক্ষমতা সীমিত।


● স্থায়িত্ব (Stability) : সমবায় সমিতি আইনের দ্বারা গঠিত বিধিবদ্ধ সংস্থা। অন্যান্য বিধিবদ্ধ সংস্থার মতো পৃথক সত্তা আছে। কোনো সদস্যের মৃত্যু বা সদস্যের পদত্যাগ সমিতির অস্তিত্বকে বিপন্ন করতে পারে না।


● মুনাফায় অংশগ্রহণ (Profit Sharing):
সদস্যদের সমস্বার্থ রক্ষার্থে সেবামূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সমিতি গড়ে ওঠে। সমিতির মূল উদ্দেশ্য মুনাফা অর্জন নয়। সমিতির আর্থিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকলে উবৃত্ত আয় সদস্যদের মধ্যে লভ্যাংশ হিসেবে বণ্টন করে দেওয়া হয়। উদ্বৃত্ত আয়ের সম্পূর্ণ অংশ লভ্যাংশ হিসেবে বণ্টন করা যায় না। সমবায় সমিতির আইন অনুসারে মুনাফার এক চতুর্থাংশ সায় তহবিল (Reserve Fund) -এ জমা রেখে বাকি অংশ সদস্যদের মধ্যে মূলধনের অনুপাতে লভ্যাংশ হিসেবে বণ্টন করা যায়।


● ঝুঁকি (Risk) : সমবায় সমিতির সদস্যদের দায় সীমাহীন বা সীমাবদ্ধ দুই-ই হতে পারে। যে সমবায় সমিতির নামের শেষে লিমিটেড (Limited) লেখা থাকে তার নয় সীমাবদ্ধ। সীমাবদ্ধ দায় বিশিষ্ট সমিতির সদস্যদের ঝুঁকির মাত্রা সীমাবদ্ধ। অন্যদিকে সীমাহীন দায়যুক্ত সমিতির সদস্যদের ঝুঁকির মাত্রা অধিক।


● ব্যবস্থাপনা (Management) :
প্রতি বছর সাধারণ সভায় পরিচালক সমিতির সদস্যগণ নির্বাচিত হন। পরিচালক সমিতিতে অন্যান্য পদাধিকারীর সঙ্গে একজন সভাপতি ও একজন সচিব থাকে। সভাপতি পরিচালন সমিতির সভায় সভাপতিত্ব করেন এবং সচিব দৈনন্দিন কাজকর্ম পরিচালনার দায়িত্ব বহন করেন।