অংশদারি কারবারের ইতিহাস History of Partnership Business

অংশীদারি কারবার [ Partnership Business ]

 


অংশদারি কারবারের ইতিহাস (History of Partnership Business )

ভারতবর্ষে অংশীদারি কারবার ‘সম্ভুয়সমুখানম' নামে পরিচিত ছিল। ভারতবর্ষে অংশীদারি প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস সুপ্রাচীন। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার তাঁর 'Corporate Life in India' গ্রন্থে উল্লেখ করেন, বৌদ্ধজাতকে (আনুমানিক 700 600 খ্রিস্টপূর্বাব্দে) কোনো অংশীদারি কারবারিবিধি না থাকলেও মূলনীতির স্বচ্ছতা ছিল। কৌটিল্য (খ্রিস্টাব্দ তিন শতকে) প্রথম অংশীদারি কারবারের বিধি রচনা করেন।

 

History of Partnership Business


একমালিকানা কারবারের সীমাবদ্ধতা থেকেই অংশীদারি কারবারের উৎপত্তি। অতিরিক্ত মূলধন ও অধিক সামর্থ্যের সন্ধানে একমালিকানা কারবার অংশীদারি কারবারে রূপান্তরিত হয়েছে। এল. এইচ. হ্যানে (L. H. Haney)-এর মতে, ব্যক্তিগত লাভের জন্য কারবারের সাধারণ উদ্দেশ্যে একাধিক ব্যক্তি কারবার পরিচালনার জন্য যে সম্পর্ক সৃষ্টি করে তাকে অংশীদারি কারবার বলে (Partnership is the relation existing between persons competent to make contracts, who agree to carry on a lawful business in common with a view to private gain.)। অন্যদিকে জন.এ.সুবিন (John. A. Shubin)-এর মতে, দুই বা ততোধিক ব্যক্তি লিখিত বা মৌখিকভাবে অংশীদারি কারবার গঠন করতে পারে এবং কারবারের দায়দায়িত্ব যৌথভাবে বহন করেন।

1932 খ্রিস্টাব্দের ভারতীয় অংশীদারি আইনের 4 নম্বর ধারা অনুসারে অংশীদারি কারবার বলতে বোঝায়, সকলের দ্বারা মিলিতভাবে অথবা সকলের পক্ষে একজনের দ্বারা পরিচালিত কারবার থেকে অর্জিত মুনাফা বণ্টনের চুক্তিবদ্ধ ব্যক্তিদের মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্ক অংশীদারি নামে পরিচিত (As per Section 4 of the Indian Partnership Act, 1932, The partnership is the relation between persons who have agreed to share profits of business carried on by all or any of them all.) 1932 খ্রিস্টাব্দের ভারতীয় অংশীদারি আইন অনুসারে সর্বনিম্ন অংশীদার সংখ্যা 2। ব্যাংকিং-এর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ 10 এবং অন্যান্য অংশীদারি কারবারের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ অংশীদার সংখ্যা 20 হতে পারে।


অংশীদারি কারবারের বৈশিষ্ট্য (Features of Partnership Business) 

● মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ (Ownership and Control) : অংশীদাররাই অংশীদারি কারবারের মালিক। মৌখিক বা লিখিত চুক্তির ভিত্তিতে অংশীদার হওয়া যায়। অংশীদারি কারবারের নিয়ন্ত্রণে অংশীদারদের সমান অধিকার থাকে কারণ প্রত্যেকেই অংশীদারই অংশীদারি কারবারের মালিক। যদি প্রত্যেকে পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণে অংশগ্রহণ না করে, তবে সক্রিয় অংশীদার নিষ্ক্রিয় অংশীদারদের হয়ে অংশীদারি কারবার নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনার কাজ করে থাকেন।


● আইনগত সত্তা (Legal Entity) : একমালিকানা কারবারের মতো অংশীদারি কারবারের কোনো স্বতন্ত্র অস্তিত্ব নেই, তাই কোনো পৃথক সত্তা নেই। অংশীদার ও অংশীদারি কারবার অভিন্ন হলেও ভারতে অংশীদারি কারবারের গঠন Indian Partnership Act, 1932 অনুসারে হয়ে থাকে।


● মূলধন (Capital) : অংশীদারি প্রতিষ্ঠানের চুক্তিপত্রে মুনাফা বণ্টনের উল্লেখ না থাকলে অংশীদারদের মধ্যে মুনাফা সমানভাবে বণ্টিত হয়। অংশীদারি প্রতিষ্ঠানে মূলধন সরবরাহ না করলেও অন্যান্য অংশীদারদের সম্মতি থাকলে অংশীদার হওয়া যায়।


● পরিচালনা (Management) : সকল অংশীদারদের অংশীদারি কারবার পরিচালনার পূর্ণ অধিকার আছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অংশীদারি কারবারের পরিচালনার দায়িত্ব এক বা একাধিক অংশীদারদের ওপর ন্যস্ত থাকে। যারা অংশীদার কারবারে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন তারা সক্রিয় অংশীদার (Active Partner) রূপে পরিচিত হন।


● স্থায়িত্ব (Stability) : অংশীদারি কারবারের স্থায়িত্ব দীর্ঘস্থায়ী হয় না। কোনো একজন অংশীদারের অনিচ্ছায় অংশীদারি কারবারের অবসান ঘটে। কারণ অংশীদারি কারবার গঠিত হয় পারস্পরিক বিশ্বাসের ভিত্তিতে।


● ঝুঁকি ও দায় (Risk and Liability) : অংশীদারি কারবারে অংশীদারদের ঝুঁকি ও দায় অসীম। ভারতের অংশীদারি আইন অনুসারে, অংশীদারগণ সকল প্রকার দায়ের জন্য ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগতভাবে দায়ী থাকেন। প্রত্যেক অংশীদার নিজের কাজ ও সহযোগী অংশীদারদের কাজের জন্য দায়ী থাকেন বলে। ঝুঁকি বেশি। 


অংশীদারি কারবারের সুবিধা (Merits of Partnership Business)

একমালিকানা ও যৌথ হিন্দু পারিবারিক কারবারের সীমাবদ্ধতার কারণেই অংশীদারি কারবারের উৎপত্তি। অতিরিক্ত মূলধন ও অধিক সামর্থ্যের সন্ধানে একমালিকানা কারবার অংশীদারি কারবারে রূপান্তরিত হয়।

 

History of Partnership Business


● সহজ গঠন (Easy Formation) : অংশীদারি কারবারের গঠন আইনগত বাধানিষেধ মুক্ত। অংশীদারি কারবারের নিবন্ধন বাধ্যতামূলক নয়।


● মূলধন ( Capital) :
অংশীদারি কারবারে একাধিক ব্যক্তির থেকে মূলধন সংগ্রহ করা সম্ভবপর হয় বলে মূলধন সংগ্রহের পরিমাণ একমালিকানা কারবার থেকে বেশি। অংশীদারদের দায় সীমাহীন বলে অংশীদারি কারবারের পক্ষে বিপুল পরিমাণ ঋণ সংগ্রহ সম্ভবপর নয়।


● দক্ষ পরিচালনা (Efficient Management) : অংশীদারি কারবারে অংশীদার এককভাবে বা মিলিতভাবে কারবার পরিচালনা করতে পারে এবং পরিচালনার উৎকর্ষতা বৃদ্ধি পায়।


● কারবারের সমৃদ্ধি (Prosperity of Business) : সীমাহীন দায়ের কারণে প্রত্যেক অংশীদার দায় যথাসম্ভব হ্রাসের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে। ফলস্বরূপ, অপচয় কমে ও উৎকর্ষতা বৃদ্ধি পায়।


● কারবারের সম্প্রসারণ (Expansion of Business) :
প্রয়োজনে নতুন অংশীদার অন্তর্ভুক্ত করে মূলধন বাড়ানো হয় এবং অংশীদারি কারবারের সম্প্রসারণে সেই অর্থ ব্যয় হয়।


● সীমাহীন দায়ের জন্য সতর্কতা (Caution for Unlimited Liability) : অংশীদারি কারবারের দেনার দায় এককভাবে বা যৌথভাবে অংশীদার বা অংশীদারদের বহন করতে হয়। ফলে কারবার পরিচালনার ক্ষেত্রে সতর্কতা ও সাবধানতা অবলম্বন করা সহজ হয়।


● অনায়াস বিলোপ সাধন (Easy Dissolution) :
অংশীদারি কারবার গঠন ও বিলোপ সাধন প্রক্রিয়া অত্যন্ত সহজ। এক বা একাধিক অংশীদারের অসম্মতিতে অংশীদারি কারবারের বিলোপ ঘটে।


● নমনীয়তা (Flexibility) : নিয়মের বাড়াবাড়ি নেই বলে অংশীদারি কারবার নমনীয় প্রকৃতির।

 


» অংশীদারি কারবারের অসুবিধা (Limitations of Partnership Business)

● সীমিত সামর্থ্য (Limited Capacity) : যৌথ মূলধনি কারবারের তুলনায় অংশীদারি কারবারের আর্থিক সংগতি ও সামর্থ্য সীমিত।


● অসীম দায় (Unlimited Liability) : অংশীদারগণ যৌথভাবে এবং ব্যক্তিগতভাবে দেনার জন্য দায়ী থাকেন। অন্যদিকে, যৌথ মূলধনি কারবারের দেনা শেয়ার মূলধন দ্বারা সীমাবদ্ধ।


● মূলধনের অভাব (Lack of Capital) :
অংশীদারি প্রতিষ্ঠানের মূলধন একমালিকানা কারবার থেকে বেশি কিন্তু যৌথ মূলধনি কারবার থেকে কম।


● স্বত্ব হস্তান্তরের বাধা (Restriction of Transfer of Right) :
সকল অংশীদার একমত না হলে নতুন অংশীদারের প্রবেশ ও অংশীদারত্ব হস্তান্তর সম্ভব নয়।


● জনগণের আস্থার অভাব (Lack of Public Confidence) :
অংশীদারি কারবারের গঠনে আইনগত বাধ্যবাধকতা না থাকার জন্য অংশীদারি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে জনগণের আস্থা জন্মায় না।


● স্থায়িত্বের অভাব (Lack of Stability) :
অংশীদারি কারবারের স্থায়িত্ব অনিশ্চিত। অংশীদারদের ইচ্ছার ওপর অংশীদারি কারবারের স্থায়িত্ব নির্ভর করে।