শিল্পের শ্রেণিবিভাগ বা সৃজন শিল্পের শ্রেণিবিভাগ Classification of Industry/Manufacturing Industry

শিল্পের শ্রেণিবিভাগ (Classification of Industry)

 

Manufacturing Industry


কাজের ভিত্তিতে শিল্পকে সাধারণত পাঁচ ভাগে ভাগ করা যায়— 

(a) নিষ্কাশন শিল্প (Extractive Industry) : প্রকৃতি থেকে আহরিত সম্পদের অর্থনৈতিক ব্যবহার যে শিল্পের মাধ্যমে সম্ভব তাকে নিষ্কাশন শিল্প বলে। অর্থনৈতিক বিবর্তনের প্রথম ধাপে অবস্থান করে বলে একে প্রাথমিক শিল্প (Primary Industry) বলে। অন্যভাবে বলা যায়, এই শিল্পের উৎপাদিত কাঁচামাল পুনরায় শিল্পে ব্যবহৃত হয় বলে একে প্রাথমিক শিল্প বলে।
উদাহরণ : (i) ভূগর্ভ থেকে খনিজ সম্পদ উত্তোলন, (ii) বনজ সম্পদ সংগ্রহ, (iii) সমুদ্র থেকে মৎস্য আহরণ।
 

(b) প্রজনন শিল্প (Genetic Industry) : যে শিল্পের প্লাসামগ্রী পুনরায় সৃষ্টির কাজে বা প্রজননের কাজে ব্যবহৃত হয় তাকে প্রজনন শিল্প বলে। উদাহরণ : (i) গবাদি পশু প্রজনন, (ii) হাঁস-মুরগি প্রজনন, (iii) মৎস্য চাষ/মৎস্য প্রজনন।
 

(c) উৎপাদন শিল্প/সৃজন শিল্প (Manufacturing Industry) : যন্ত্র ও শ্রমের সাহায্যে কৃষিজাত সম্পদ ও প্রাকৃতিক সম্পদের রূপান্তর ঘটিয়ে মানুষের উপযোগ সৃষ্টিতে ব্যবহৃত হয় বলে তাকে উৎপাদন শিল্প বলে। এই শিল্পে নিষ্কাশন বা প্রাথমিক শিল্পের উৎপাদিত সামগ্রী ব্যবহৃত হয় বলে একে গৌণ শিল্প (Secondary Industry) বলে। অন্যভাবে বলা যায়, যখন একটি শিল্পের উৎপাদিত পণ্য জন্য একটি শিল্পে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয় তখন তাকে গৌণ শিল্প বলে।
উদাহরণ : (i) তৈল শোধন শিল্প, lii) ওষুধ শিল্প, (ii) সিমেন্ট শিল্প, লৌহ-ইস্পাত শিল্প।
 

(d) নির্মাণ শিল্প (Constructive Industry) : যখন বিভিন্ন প্রকৃতি ও শিল্পজাত উৎপাদন ব্যবহার করে স্থায়ীভাবে ব্যবহারোপযোগী এবং উৎপাদন করা হয় তখন তাকে নির্মাণ শিল্প বলে।
উদাহরণ : (i) সড়ক তৈরি (34 নম্বর জাতীয় সড়ক), (ii) বাঁধ তৈরি (ফারাজা বাঁধ), (III) সেতু তৈরি
(দ্বিতীয় হুগলি সেতু, নিবেদিতা সেতু)।
 

(e) সেবা শিল্প (Service Industry) : ও যেসব শিল্পের উৎপাদিত সামগ্রী সেবামূলক কাজে ব্যবহৃত হয় এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার পক্ষে অপরিহার্য তাকে সেবা শিল্প বলে।
উদাহরণ : (1) গ্যাস ও বিদ্যুৎ উৎপাদন, (i) পানীয় জল সরবরাহ, (ii) ব্যাংক- বিনা- টেলিযোগাযোগ।

 

উৎপাদন বা সৃজন শিল্পের শ্রেণিবিভাগ (Classification of Manufacturing Industry)


উৎপাদন প্রক্রিয়ার বৈশিষ্ট্য অনুসারে উৎপাদন বা সৃজন শিল্পকে পাঁচভাগে ভাগ করা যায়-

(a) বিশ্লেষণ শিল্প (Analytical Industry) : যে শিল্পের সাহায্যে একটি পদার্থকে বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন পণ্যসামগ্রী প্রস্তুত করা হয় তাকে বিশ্লেষণ শিল্প বলে। উদাহরণ : খনিজ তেল শোধন করে পেট্রোল, ডিজেল, কেরোসিন পাওয়া যায়।
 

(b) যৌগিক বা মিশ্রণ শিল্প (Synthetic Industry) : যে শিল্পে ভিন্ন ভিন্ন পদার্থের মিশ্রণ ঘটিয়ে নতুন পণ্য উৎপাদন হয় তাকে মিশ্রণ শিল্প বলে। উদাহরণ : গৌহ আকরিক, ম্যাঙ্গানিজ, কয়লা ও চুনাপাথরের মিশ্রণের ফলে ইস্পাত প্রস্তুত হয়।
 

(c) প্রক্রিয়াকরণ শিল্প (Processing Industry) : যে শিল্পে কাঁচামাল উৎপাদন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যবহারোপযোগী পণ্যে রূপান্তরিত হয় তাকে প্রক্রিয়াকরণ শিল্প বলে। উদাহরণ : কাঁচা পাট থেকে থলে ও পাটজাত সামগ্রী প্রস্তুতকরণ।
 

(d) সংযোজন শিল্প (Assembling Industry) : যে শিল্পে পৃথক পৃথক অংশ একত্রিত করে একটি ব্যবহার্য জিনিস তৈরি করা হয় তাকে সংযোজন শিল্প বলে। উদাহরণ : গাড়ি (গাড়ির যন্ত্রাংশ একত্রিত করে গাড়ি তৈরি করে মারুতি লিমিটেড), কম্পিউটার (কম্পিউটারের বিভিন্ন প্রজন্মের যন্ত্রাংশ একত্রিত করে কম্পিউটার প্রজন্ম অনুসারে তৈরি করে আই বিএম)।

(e) সংযুক্ত শিল্প (Integrated Industry) : যে শিল্পে উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায় সুসংবদ্ধ করা হয় তাকে সংযুক্ত শিল্প বলে।
উদাহরণ : লৌহ ও ইস্পাত শিল্প।

Manufacturing Industry

 

শিল্পে উৎপাদিত পণ্যের ব্যবহারিক দিক (Practical side of the Manufacturing goods in Industry)
 

শিল্পে উৎপাদিত পণ্যকে ব্যবহারিক দিক থেকে দু-ভাগে ভাগ করা যায়— 

(a) ভোগ্যপণ্য শিল্প (Consumer Goods Industry) : যখন শিল্পের উৎপাদিত পণ্যসামগ্রী সরাসরি ভোগকারীর অভাব মোচন করে তখন তাকে ভোগ্যপণ্য শিল্প বলে। উদাহরণ : খাদ্য, বস্ত্র।
 

(b) মূলধনি পণ্য উৎপাদন শিল্প (Capital Goods Industry) : যখন শিল্পের উৎপাদিত পণ্যসামগ্রী সরাসরি ভোগকারীর অভাব মোচনে ব্যবহার হয় না কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন পণ্য উৎপাদনের সহায়ক হিসেবে কাজ করে তখন তাকে মূলধনি পণ্য উৎপাদন শিল্প বলে। উদাহরণ : যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক, সুতো। 

 

শিল্পের গুরুত্ব বা সামাজিক তাৎপর্য (Importance or Social Significance of Industry)


শিল্পের সাহায্যে মানুষের চাহিদার উপযোগী পণ্যসামগ্রী বা সেবাদ্রব্য উৎপাদন হয়। ব্যাবসাবাণিজ্যের সাহায্যে শিল্পসামগ্রী ভোক্তার কাছে পৌঁছে যায়। যে-কোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নতিতে শিল্পের অবদান অনস্বীকার্য। কারবারি কার্যকলাপ শিল্পকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। আধুনিক সমাজে শিল্পজাত পণ্যের চাহিদা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। আধুনিক সমাজের সঙ্গে শিল্পের উন্নয়নের নিবিড় সম্পর্ক বর্তমান। শিল্প কেবলমাত্র পণ্য উৎপাদন বা সেবা প্রদানই করে না ব্যাবসাবাণিজ্যকে সচল করে অর্থনীতিতে গতির সঞ্চার করে। পরিকাঠামোর উন্নতি, জাতীয় আয় বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, কর্মসংস্থান, সরকারের আয়বৃদ্ধি ও শিল্পের সঙ্গে সম্পর্কিত মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সদর্থক ভূমিকা পালন করে। চালস ডিকেন্স (Charles Dickens) যথার্থই বলেছেন, “শিল্প হল কারবারের আত্মা এবং অগ্রগতির মূল কেন্দ্র।”
 

শিল্পের গুরুত্বগুলি নীচে আলোচনা করা হল—

(a) পণ্য উৎপাদন ও সেবা উৎপাদন (Production of Goods and Services) : শিল্প কাঁচামাল বা মূলধনি দ্রব্যের সাহায্যে পণ্য বা সেবা উৎপাদন করে।
 

(b) ব্যাবসাবাণিজ্যের প্রসার (Development of Trade and Commerce) : শিল্পের উন্নতি এবং শিল্পজাত পণ্যসামগ্রী বা সেবাসামগ্রী ভোগকারীর কাছে পৌঁছে দিতে ব্যাবসাবাণিজ্যের প্রয়োজন। তাই শিল্পের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে ব্যাবসাবাণিজ্যের প্রসার ঘটে।


(c) কর্মসংস্থান (Employment) : শিল্পের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পায়। পৃথিবীর শিল্পোন্নত দেশগুলিতে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান শিল্পের সঙ্গে সম্পর্কিত।


(d) জাতীয় আয় বৃদ্ধি (Increase of National Income) : শিল্প জাতীয় আয় বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
পালন করে। আমাদের দেশ জাতীয় আয়ের নিরিখে চতুর্থ স্থানে এবং শিল্প উন্নয়নের নিরিখে দশম স্থানে অবস্থান করে। 

(e) জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন (Improve Standard of Living) : শিল্পের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় আয় যেমন বৃদ্ধি পায় তেমনি গড় আয় বা মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পায়। জীবনযাত্রার মান উন্নয়নকে শিল্প প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করে।


(f) পরিকাঠামো উন্নয়ন (Infrastructural Development) : পরিকাঠামো উন্নয়নে শিল্পের অবদান
অনস্বীকার্য। শিল্পের উন্নয়নের জন্য পরিকাঠামোগত উন্নয়ন প্রয়োজন। আবার শিল্প উন্নয়নের ধারা অব্যাহত থাকলে পরিকাঠামোর উন্নয়ন ঘটতে বাধ্য।