অর্থনৈতিক উন্নয়নে কারবারের গুরুত্ব Importance of Business in Economic Development

1. অর্থনৈতিক উন্নয়নে কারবারের গুরুত্ব (Importance of Business in Economic Development):

Importance of Business in Economic Development


(a) ব্যাপক উৎপাদন (Extensive Production) : সমাজের প্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী উৎপাদন ও বণ্টনের কারণেই কারবার গড়ে ওঠে। উপযুক্ত গুণমান সম্পন্ন পণ্যসামগ্রী ক্রেতার কাছে ন্যায্য দামে সঠিক সময়ে সরবরাহ করাতেই কারবারের সাফল্য। আমুল ন্যায্য দামে ক্রেতাকে গুণমান সম্পন্ন বাটারের স্বাদ দিতে পেরেছিল। যা বিগত 60 বছর ধরে আমূলের সাফল্যের ধারাকে অব্যাহত রেখেছে।

 

(b) কম ব্যয়ে বেশি উৎপাদন (More Production at a Minimum Cost) : কারবার ব্যাপক পরিমাণ পণ্য উৎপাদন ও সেবা প্রদান করে চলেছে। এতে এক দিকে যেমন জাতীয় আয় বৃদ্ধি পাচ্ছে অন্যদিকে উৎপাদিত পণ্য কম মূল্যে উৎপাদিত হচ্ছে। উদাহরণ: 2005 খ্রিস্টাব্দে ভারতের জাতীয় আয় ছিল 1 ট্রিলিয়ান ডলার (1 ট্রিলিয়ান = 1 মিলিয়ান মিলিয়ান)।


(c) দ্রব্যের গণবণ্টন (Mass Distribution of Goods) :
পণ্য উৎপাদন বা সেবা প্রদানই নয় কারবার নিরবচ্ছিন্ন বণ্টন ব্যবস্থা বজায় রেখেছে। উদাহরণ : রেশন ব্যবস্থা।


(d) জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন (Improve Standard of Living) : কারবার একটি স্বাধীন জীবিকা। সমাজ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন পণ্য বা সেবা উৎপাদন ও বণ্টন সম্ভব হচ্ছে। নতুন নতুন পণ্য বা সেবা অন্তর্ভুক্তির ফলে বাজারে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে এবং আয়ের সুযোগ বাড়ছে। কারবারের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে মুনাফা বৃদ্ধি পাচ্ছে। জাতীয় আয়ে প্রভাব পড়ছে এবং সেই আয় বণ্টনের মধ্য দিয়ে জীবনযাত্রার মান পরিবর্তিত হচ্ছে।


(e) জাতীয় সম্পদের যথাযথ ব্যবহার (Proper Utilisation of National Resources) : কারবার পৃথিবীর অফুরন্ত সম্পদের রূপান্তর ঘটায়। প্রাকৃতিক সম্পদকে রূপান্তরের মাধ্যমে ভোগকারীর কাছে ভোগের উপযোগী পণ্য হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এর ফলে ভোগের আকাঙ্ক্ষা বৃদ্ধি পায়। বেশি পরিমাণ ভোগ্যপণ্য জীবনযাত্রার মানের উন্নতি ঘটায় এবং দেশের আর্থিক বৃদ্ধি তরান্বিত করে।


2. সামাজিক উন্নয়নে কারবারের গুরুত্ব (Importance of Business in Social Development):


(a) মধ্যস্থ কারবারির উদ্ভব (Growth of Middleman) :
ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে দূরত্ব দূর করা সব সময় সম্ভবপর নয়। সেই কারণে মধ্যস্থকারীরা ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে দূরত্ব দূর করার কাজ করে থাকে। মধ্যস্থকারীরা পণ্য বা সেবার মূল্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। উদাহরণ : পাইকারি ও খুচরো বিক্রেতা।


(b) যন্ত্রের ব্যবহার (Use of Machine) :
কারবার পণ্য-সেবার জোগানের ধারা অব্যাহত রাখতে যন্ত্রের মাধ্যমে কম সময়ে বেশি পণ্য উৎপাদনে মনোনিবেশ করে থাকে। উদাহরণ : হস্তচালিত তাঁতের বদলে যন্ত্রচালিত পাওয়ারলুম।


(c) মুদ্রার প্রচলন (Introduction of Currency) : কারবারের উদ্ভবের পর্যায়ে পণ্যের সঙ্গে পণ্যের বিনিময় হত। মুদ্রার উদ্ভবের ফলে মুদ্রা কারবারের বিনিময় মাধ্যম হিসেবে কাজ করে চলেছে।


(d) পারস্পরিক নির্ভরশীলতা (Mutual Dependence) :
কারবারের মাধ্যমে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ই উপকৃত হয়। ক্রেতা পণ্য বা সেবা থেকে উপযোগ পায়। বিক্রেতা পণ্য বা সেবা পরিবেশনের মাধ্যমে মুনাফা অর্জন করে উপকৃত হয়। 

 

3.কারবারের মুখ্য উদ্দেশ্য ও গৌণ উদ্দেশ্য (Primary and Secondary Objectives of Business )

Importance of Business in Economic Development

 

অর্থনৈতিক কাজকর্মের নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য থাকে। নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক কাজ পরিচালিত হয়। কারবার অর্থনৈতিক কাজের সঙ্গে যুক্ত বলে কারবারের উদ্দেশ্যও নির্দিষ্ট। অর্থনৈতিক উদ্দেশ্যকে দুভাগে ভাগ করা হয় : মুখ্য উদ্দেশ্য ও গৌণ উদ্দেশ্য।

 

মুখ্য উদ্দেশ্য (Primary Objectives) : যে প্রধান উদ্দেশ্যকে কেন্দ্র করে কারবার পরিচালিত হয় তাকে মুখ্য উদ্দেশ্য বলে। সেই অর্থে মুনাফা অর্জন কারবারের মুখ্য উদ্দেশ্য, কিন্তু একমাত্র উদ্দেশ্য নয়। কারবারের মুনাফা অর্জন সম্ভবপর হয় সমাজের মানুষের অভাব মোচনের মাধ্যমে। ক্রেতার সন্তুষ্টিবিধানের মধ্যে দিয়ে কারবারের কারবারের বিস্তার ও সাফল্য নির্ভর করে। পিটার এফ. ড্রাকার মনে করেন, কারবারের কাজ ক্রেতা সৃষ্টি। কারবার সম্পদের সদব্যবহারের মধ্যে দিয়ে পণ্যের সংযুক্তি ও মান উন্নয়ন করে চলে। কারবার সম্পদের অপব্যহার রোধ করে এবং পূর্ণ ব্যবহারের লক্ষ্যে অগ্রসর হয়।

 

গৌণ উদ্দেশ্য (Secondary Objectives) : মুখ্য উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য কারবারের গৌণ উদ্দেশ্যও সফল করতে হয়। পিটার এফ ড্রাকার মনে করেন, মুনাফা অর্জন দিয়ে কারবারের বৈশিষ্ট্য নির্ণয় করা যায়
না। এর দ্বারা কারবারের অস্তিত্ব পরীক্ষা করা যায়। মুখ্য উদ্দেশ্য ছাড়াও কারবারের গৌণ উদ্দেশ্যগুলি হল:


(a) অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য (Economic Objectives),
(b) সামাজিক উদ্দেশ্য ( Social Objectives),
(c) জাতীয় উদ্দেশ্য (National Objectives),
(d) মানবিক উদ্দেশ্য (Human Objectives) 


(a) অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য (Economic Objectives) : সমাজের মানুষের অভাব মোচনের জন্য কারবার
উৎপাদন, বণ্টন ও বিনিময়ের প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখে। অর্থনৈতিক কাজকর্মের প্রথম ধাপ উৎপাদন ও
বণ্টনের মাধ্যমে মানুষের অপরিসীম অভাব মোচনের জন্য উৎপাদনের ধারা অব্যাহত রাখা এবং
ভোগকারীর কাছে যথাসময়ে পৌঁছে দেওয়া।


(b) সামাজিক উদ্দেশ্য (Social Objectives) : কারবার সমাজ নির্ভর অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান। সমাজের
বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কারবারের বিকাশও ঘটে চলে। সমাজবদ্ধ মানুষের জন্য উপযুক্ত মানের পণ্য ও সেবা প্রদান কারবারে আবশ্যিক কর্তব্য। এর ফলে জীবনযাত্রার মানের উন্নতি ঘটে এবং কর্মসংস্থানের মধ্যে দিয়ে ক্রয় ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। মোট জাতীয় আয় বৃদ্ধি পায় এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন অব্যাহত থাকে।


(c) জাতীয় উদ্দেশ্য (National Objectives) : দেশের আর্থিক নীতি, শিল্পনীতি ও বাণিজ্যনীতি অনুসারে কারবার পরিচালিত হয়। জাতীয় সম্পদের সদ্ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে জাতীয় উন্নয়ন ও দেশের স্বার্থ
বজায় রাখা কারবারে উদ্দেশ্য। কারবারের উৎপাদিত পণ্য শুধুমান দেশের মানুষের চাহিদা পূরণ করে না, উৎপাদিত পণ্য রপ্তানির মধ্যে দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। কারবারি প্রতিষ্ঠান ও জাতীয় স্বার্থে প্রশিক্ষণ ও গবেষণায় অর্থব্যয় কারবারের অবশ্য কর্তব্য।


(d) মানবিক উদ্দেশ্য (Human Objectives): সমাজের মানুষের বিভিন্ন ধরনের অভাব পুরণ কারবারের উদ্দেশ্য। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ কারবারের সঙ্গে বিভিন্নভাবে জড়িত। ক্লেতা, বিনিয়োগকারী, শ্রমিক-কর্মচারী, পাওনাদার, দেনাদার প্রত্যেকের স্বার্থ সুরক্ষিত রাখা কারবারের কর্তব্যের অন্তর্ভুক্ত। উপযুক্ত লোককে উপযুক্ত কাজের জন্য নির্বাচন ও নিযুক্তি কারবার করে থাকে। ব্যবস্থাপকগণ কারবার পরিচালনা করে। শ্রমিক কর্মচারীদের ব্যবস্থাপনায় অংশগ্রহণের মধ্যে দিয়ে কারবার মানবিক দায়িত্ব পালনে সক্ষম। পণ্যের গুণমান বজায় রাখা ন্যায্য মূল্যে পণ্য সরবরাহের মধ্যে দিয়ে মানবিক সম্পর্কের বিকাশ ঘটে।